Ana Symum Rima

গ্রীষ্মের প্রকৃতিতে বসন্তের ছোঁয়া

সাহিত্য

গ্রীষ্মে নজর কাড়া চুরি করা লাল, হুলুদ, বেগুন রঙ ছেয়ে গেছে কুঞ্জে কুঞ্জে। যেনো প্রকৃতিতে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। তপ্ত আকাশের নীচে সোনার মাঠ-ঘাট যেনো উনুনে পুড়ছিল। উষ্ণতা বাসা বেঁধেছিল মানব শরীরও। গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে প্রকৃতিতে ছিল ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস। সবুজ মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির। তপ্ত রোদে কৃষকের স্বপ্ন পুড়ে ছাই ছাই।

গ্রীষ্মের দাপটের পর প্রতীক্ষিত বর্ষনে আড়মোড়া দিয়ে প্রকৃতি জেগে উঠেছে কমল, শান্ত ও সজীব রুপে। আমাদের তপ্ত ধরায় নেমে এসেছে শান্তির পরশ। ঝড়ছে টিপটিপ বৃষ্টি। টিনের চালে ঝুমঝুম শিলা বৃষ্টির শব্দ মনে হচ্ছে ষোড়শী মেয়ে নুপুর পায়ে নেমে এসেছে।

নিজেকে হারিয়ে ফেলি সীমাহীন গন্তব্যে। ইচ্ছে করে দু-চারটা সফেদ শিলা হাতে নেই। চূর্ণ্য করে আলতো হাতে করে গাল ছুঁয়ে দেই। বৃষ্টির জলে একটুখানি পায়ের পাতা ভিজিয়ে নেই।

বৃষ্টি ভেজা মধ্যে রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টি উপভোগ করি। আলতো করে দু’চারটা শিলা কুড়িয়ে নেই। নিমিষেই জল গড়িয়ে আসে কমল হাতে। গ্রীষ্মের খরতাপের পর আমাদের ধরা এখন শান্ত-শীতল।

পাশের বেলকনিতে বৃষ্টির জলে ভিজছে এক যুগল। মনে হচ্ছে হারিয়ে যাচ্ছে তারা মিলনের সন্ধিক্ষণে। এ যেন মহাকাল ভেদ করে গ্রীষ্মের খরতাপ কে শান্ত করে, বৃষ্টি বুঝি স্বার্থক হল।

সোনার মাঠে-ঘাটে বৃষ্টির জলের ফোঁটায় ফোঁটায়  কৃষকের হাসির প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে।জারুল, সোনালু আগুন রাঙা কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপ ও বেলি বৃষ্টির জলে ভিজে চুপসে কুটিকুটি।

প্রতি ফোঁটা বৃষ্টির জল গ্রীষ্মের অত্যাচারের ক্ষত সারায়। বৃষ্টির ফোঁটার ছন্দে ছন্দে মানব মুক্তির পথ দেখায়।

সবুজ মাঠ-ঘাট দাবদাহে চৌচির। ক্ষমাহীন আকাশের নীচে ঝলসে যাওয়া শরীরে একটু শীতলতা লেগে থাকে। বৃষ্টির শীতল হাওয়ায় তাপ ম্লান করে তপ্ত পৃথিবী শান্ত এখন। তৃষাতুর কৃষক, রিক্সা চালকের ধরা এখন জল ভরা।

গ্রীষ্মে প্রকৃতি প্রাণবন্ত উৎসবমুখর রঙে সজ্জিত।  নজর কাড়া চুরি করা লাল, হুলুদ, বেগুন রং ছেয়ে গেছে কুঞ্জে কুঞ্জে।

কৃষ্ণচূড়া:

কংক্রিটের এই নগরীতে কৃষ্ণচূড়ার লাল রং উপচে পরেছে। ছাতা পোড়া রোদে কৃষ্ণচূড়ার লাল পাপড়ি যেন ঝলক দিচ্ছে আকাশে আকাশে। আগুন রাঙা কৃষ্ণচূড়ার লাল রং চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যে নিমেষেই মন ভুলে যাই। থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়া শোভা পায় কিশোরীর খোঁপায় খোঁপায়।

কৃষ্ণচূড়া ফুলে ফুলে লাল হয়েছে বনে বনে।এ যেনো

লাল রং এ বন ডুব দিয়েছে। কাক ডাকা তপ্ত  দুপুরে কৃষ্ণচূড়ার টকটকে লাল রং এর ঝলকানিতে রমনা পার্ক যেনো তারুণ্য চঞ্চলতা ফিরে পেয়েছে। 

কৃষ্ণচূড়ার সবটুকু রং ছুঁড়ে মেরেছে গগনচুম্বী আকাশে। গ্রীষ্মের খরতাপে কৃষ্ণচূড়া দিগন্ত জোড়া পৃথিবীকে রক্তিম বর্ণে সজ্জিত করে হতাশার বুকে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়।

কনকচূড়া :

গ্রীষ্মের খরতাপে মধ্যে দিয়ে ও হলুদ রঙের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে। এ যেন তপ্ত ধরায় ফাগুন এনে দিয়েছে। হলুদ রঙের কনকচূড়া সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে প্রকৃতিতে ফুঁটিয়ে তুলছে বর্ণিল আভা। কনকচূড়া রঙে ঢংয়ে গ্রীষ্মের দাপটের সাথে নৈসর্গিক সৌন্দর্য নিয়ে এসে জন জীবনকে একটু হলে স্বত্বি ফিরে এনে দেয়।

কাঠগোলাপ :

এই যে ক’দিন আগে লিখেছিলাম :-
আবার কবে বৃষ্টি নামবে
কাঠগোলাপ বৃষ্টিতে ভিজবে
কবে পাখি গাইবে গান
একটুখানি বৃষ্টির জল
আঙুলে আঙুলে এসে জরিয়ে যাবে।

ঝিঁঝি পোকার ঝিঁঝি শব্দে
মুখরিত হবে ঝোপঝাড়।
আলগোছে একটা কাঠগোলাপ ছিঁড়ে
গুজে দিবে তুমি চুলের গোছায়।

গ্রীষ্মের খরতাপে ক্ষত-বিক্ষত প্রকৃতির মাঝে
কাঠগোলাপের গোলাপি মায়ায় জড়িয়ে গেছে জীবন। সবুজের আড়ালে আবডালে ওঁৎ পেতে আছে সাদা সাদা কাঠগোলাপ।

এই ইট পাথরের শহরে সফেদ রাঙা বেলি আর কাঠগোলাপ ফিসফিস করে বাতাসে সুগন্ধি ছড়িয়ে দেয়। প্রলাপ জড়ানো বাতাসে ফুলে ফুলে গানে গানে কাঠগোলাপের ঘ্রাণ ভরে যায়। মুখরিত হয়ে উঠে তপ্ত হাওয়া।

সোনালু ফুল:

গ্রীষ্মে প্রকৃতি প্রাণবন্ত উৎসবমুখর রঙে সজ্জিত।
সোনালু ফুল ফিসফিস করে প্রকৃতিতে হলুদরঙের অনুগ্রহ প্রকাশ করে। প্রকৃতি গ্রীষ্মের উষ্ণতায় রঙে ঢংয়ে সাহসী বার্তা দেয়। শাখায় শাখায় ঝুলে থাকা
থোকা থোকা সোনালু ফুল দৃষ্টি কেড়ে নেয়।

জারুল ফুল:

ইট পাথরের শহরে জারুল প্রকৃতিতে এক নব জীবন ফিরিয়ে দেয়। শহরে বেগুনি রঙের ছোঁয়া লেগেছে কুঞ্জে কুঞ্জে। গ্রীষ্মের নৈসর্গিক দৃশ্য এ যেনো বসন্তকে হার মানায়। ইয়া প্রকান্ড গাছের  ডগায় ডগায় পাতার ওপরে পুঞ্জে পুঞ্জে বেগুনি রঙের জারুলফুল ফুটে থাকে।

প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ তাই তো বলেছেন:

ভিজে হয়ে আসে মেঘে এ-দুপুর চিল
একা নদীটির পাশে জারুল গাছের ডালে
বসে বসে চেয়ে থাকে ওপারের দিকে।

তৃষ্ণার্ত নদী-নালা, খাল -বিল পুকুর ঘাট গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে টুইটুম্বর। বৃষ্টি যেন নদী, খাল-বিল, পুকুরে প্রাণ ফিরে দিয়েছে।

পাখির গুনগুন গানে বাতাস ভরে যায়। প্রকৃতির ফিসফিস সুরে পৃথিবী নতুন করে জেগে উঠে। চড়ুই পাখি আর শালিকের ডাকে সন্ধ্যা ধীর পায়ে নেমে আসে পৃথিবীর বুকে।

ধূসর রাঙা দিগন্ত জোড়া পৃথিবী বৃষ্টির জলে আমাদের কষ্টগুলোকে ধুয়ে মুছে দিয়ে যায়। গ্রীষ্মের খরতাপ বিদায় নিয়ে ফিসফিস করে মলয় বাতাস যুগলবন্দী হয়ে থাকে। আর সবুজ পাতা আলতো করে নরম তুলতুলে গাল ছুঁয়ে দিয়ে যায়।

লেখক: এ্যানা সাইমুম রীমা
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।