ছিটানো প্রশিক্ষণ govt foreign project scam

কীটনাশক ছিটানো শিখতে বিদেশ যেতে চান ১০৩ কর্মকর্তা

বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক মন্দার এ সময়ে জমিতে কীটনাশক কীভাবে ছিটাতে হয় তা শিখতে বিদেশ যেতে চান ১০৩ কর্মকর্তা। চলমান অর্থনৈতিক সংকটে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। সরকারি খরচে বিদেশ সফরে রয়েছে বিধিনিষেধও। তারপরও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চলছে বিদেশ সফরের আয়োজন। ড্রোনের মাধ্যমে ফসলের জমিতে কীটনাশক ছিটানো শিখতে বিদেশ যেতে চান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) ১০৩ কর্মকর্তা। ১২ ব্যাচে বিদেশ প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এতে গড়ে মাথাপিছু ব্যয় হবে ৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকারও বেশি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘জিআইএস ও স্যাটেলাইটভিত্তিক রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রপ মনিটরিং ও প্রধান প্রধান ফসলের জমির পরিমাণ নির্ণয়’ শীর্ষক প্রকল্পে বিদেশ সফরের এই প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নের এই প্রকল্পে বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। সরকারি অর্থ যেন অযথা ব্যয় না হয় সে জন্য সামনের প্রকল্প মূূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এ বিষয়ে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাওয়া হবে বলে সময়ের আলোকে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সময়ের আলোকে  বলেন, ‘প্রকল্প জনকল্যাণের জন্য নেওয়া হলেও অসাধুরা নিজেদের সম্পদ বিকাশের হাতিয়ার হিসেবে তা ব্যবহার করেন। তারা অযৌক্তিক অহেতুক কিছু ব্যয় যুক্ত করেন। প্রকল্প প্রস্তাব দেওয়ার সময় অনেক বেশি ব্যয় দেখান। যার মাধ্যমে তারা নিজেদের পকেট ভারী করেন।’

তিনি বলেন, ‘একটি প্রকল্পে কাজের প্রয়োজনে বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়া যেতে পারে। তবে সেটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। যারা বিদেশ প্রশিক্ষণে যাবেন তারা ওই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, সেই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। যাদের কাজের জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হবে শুধু তাদেরই প্রশিক্ষণে পাঠানো উচিত।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ের পরিচালক মুহাম্মদ এমদাদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, ‘প্রকল্প এখনও পাস হয়নি। আমরা প্রস্তাবনা দিয়েছি মাত্র। পরিকল্পনা কমিশন দেখবে, কাটছাঁট হবে তারপর পাস হবে। তখন বিদেশ প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসতে পারে আবার বাদও দিতে পারে।’

যদি অর্ধেক কর্মকর্তা বিদেশে প্রশিক্ষণ নেন বা কেউ যদি প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ না পান তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো অসুবিধা হবে না? 

জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবনা দেওয়ার সময় আমরা একটু বেশিই দিই।’ ড্রোনের মাধ্যমে জমিতে কীটনাশক ছিটানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কীটনাশক ছিটালে খরচ বেশি হয়, অপচয় হয়। কিন্তু ড্রোনের মাধ্যমে দিলে সঠিকভাবে পোকায় ধরা ফসলে কীটনাশক দেওয়া যায়। কোথায় দিতে হবে তা শনাক্ত করা যায়। এটি আধুনিক পদ্ধতি।’

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) ফসলের ১২ হাজার ৮৯৬টি প্রদর্শনী বাবদ মোট ১২ কোটি ৬৪ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে, যা প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। শুধু জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রয়োজনের নিরিখে প্রদর্শনীর সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে।

ডিপিপিতে এক হাজার ২৮৯টি মাঠ দিবস, ৭০টি আঞ্চলিক কর্মশালা, দুই হাজার ৭৬৩ ব্যাচ কৃষক প্রশিক্ষণ এবং ১০৫ ব্যাচ এসএএও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসের সংখ্যা ও ব্যয় নিয়ে সভায় আলোচনা হতে পারে।

প্রকল্পের আওতায় ১০৩ জন কর্মকর্তাকে ১২ ব্যাচে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সফরে পাঠানো হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, ড্রোনবিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জিআইএস, আরএস ও কৃষিতে আইসিটি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে সব প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সফরের সংস্থান রাখা হয়েছে বলে ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। জিওবি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহারের স্বার্থে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের যৌক্তিকতা বিষয়ে পিইসি সভায় বিস্তারিত জানা যেতে পারে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে ১০২টি হাই কনফিগারেশন ডেস্কটপ কম্পিউটার, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের জন্য দুই হাজার ১৪৯টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল, ১০টি এয়ার কন্ডিশনার, ২টি ফ্রিজ, অফিস সরঞ্জাম ও অফিস আসবাবপত্র খাতে ছয় কোটি ৭৮ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব খাতের ব্যয় যুক্তিযুক্তভাবে নির্ধারণ করার বিষয়ে সভায় আলোচনা হতে পারে।

ডিপিপিতে জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং কার্যক্রম পরিচালনা ও ডিজাইনের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরির মোট ১৮ জন পরামর্শকের সংস্থান রাখা হয়েছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ কোটি ছয় লাখ টাকা। এত অধিকসংখ্যক পরামর্শক নিয়োগের যৌক্তিকতার বিষয়ে পিইসি সভায় আলোচনা করা হবে।

প্রস্তাবিত ডিপিপিতে ইন্টারনেট বিল, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা, অডিও-ভিডিও ডকুমেন্টেশন, মুদ্রণ ও বাঁধাই, স্টেশনারি, প্রকাশনা, ভ্রমণ-ভাতা, পেট্রোল ও লুব্রিকেন্ট, গ্যাস ও জ্বালানি, যানবাহন মেরামত ও সংরক্ষণ, অফিস সরঞ্জাম মেরামত ও সংরক্ষণ এবং কম্পিউটার সরঞ্জাম মেরামত ও সংরক্ষণ বাবদ প্রায় ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। এসব অঙ্গের ব্যয় যৌক্তিকভাবে হ্রাস করতে বলা হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২২ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। রবি মৌসুমের দানাদার ফসল বোরো ধান, গম ও ভুট্টা উৎপাদনকারী এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ যেমন: লবণাক্ততা, খরা, বন্যা ও পাহাড়ি ঢল-ভাসমান বন্যাপ্রবণ ৩৫টি জেলার ৩০৭টি উপজেলায় প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রকল্পের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে-জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) ও রিমোট সেন্সিং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার ৩৫টি জেলার ৩০৭টি উপজেলার গ্রুপ মনিটরিং এবং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ফসলের জমির পরিমাণ ৯০ শতাংশ সঠিকভাবে নির্ণয় করা এবং প্রকল্প এলাকার গ্রুপ ম্যাপিং করাসহ ডিএইর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ ও উপজেলা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে সহযোগিতা প্রদান। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকার ২০টি জেলার হ্যাজার্ড ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের জমি এবং ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে অঞ্চলভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তিগত সেবা প্রদান করা এবং দ্রুত অভিযোজন ও পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করা। ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে রোগ-পোকামাকড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের জমি শনাক্ত করা, ফসলের জমিতে ৮০ শতাংশ দক্ষতার সঙ্গে কীটনাশক স্প্রে ও সার সুপারিশসহ কৃষককে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা, কৃষকের ফসল উৎপাদন ব্যয় ২০ শতাংশ হ্রাস করা এবং ফসলের ফলন ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে কৃষিতে ইনোভেশন কার্যক্রম শক্তিশালী করা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সদর দফতরসহ ৬৪ জেলায় জিআইএস, রিমোট সেন্সিং ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ জনবল তৈরি, জিও স্পেশাল ডাটাবেজ ও ওয়েবপোর্টাল প্রস্তুত করার মাধ্যমে ডিএইর বিভিন্ন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নসহ ফসল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ সঠিক তথ্য ব্যবহার নিশ্চিত করা।