Nipa

হঠাৎ তুমি এলে

সাহিত্য

অরন্য নিজেকে কোনরকম সামলিয়ে নিলো, তখন সকাল আট টা বাজে। ভিডিওটা এর মধ্যে পুরোপুরি ভাইরাল হয়ে যায়। আমি পুলিশের সাহায্য নিলাম। পুলিশ খোঁজ লাগাল। কেটে গেল আরও তিন ঘন্টা। তিন ঘন্টা পর পুলিশ আমাকে কল করে বলল-
– অরন্য সাহেব আপনি একটু থানায় আসেন তো।

আমি তারাহুরা করে থানায় গেলাম। গিয়ে নিজের প্রিয়তমার মৃতদেহটা দেখলাম। আমার চিনতে মোটেও ভুল হয় নি এ আমার রূপা। আমার পাগলি টা। যে নাকি সারাদিন বকবক করেই যেত আমাকে দেখলে লাফিয়ে উঠত। সে ঐদিন আমাকে দেখে বলছে নাঃ আরে ইয়ার আমার দিকে তাকিয়ে আছ কেন?

পুলিশ শুধু বলেছিল এটাই কি রূপা। আমি পুলিশের কথার জাবাব না দিয়ে রূপাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। পুলিশের বুঝতে বাকি রইল না এটাই আমার পাগলি টা।

রূপাকে ধরে বলতে লাগলাম
– আমাকে তো একটু বুঝাতে পারতে, বলতে পারতে। আমার থেকে দূরে সরে কেন গেলে? আমি তোমাকে ছাড়া কিভাবে থাকব একটা বারও ভাবলে না?

সারাদিন এত বকবক করতে এত কথা বলতে একটাবারও আমাকে ভরসা করে সমস্ত কিছু বলতে পারলে না? শেষমেষ আমিই তোমাকে ভুল বুঝলাম। আমার সাথে অভিমান করার কি দরকার ছিল রূপা। আমি যে তোমায় ছাড়া থাকতে পারব না।

পুলিশ রূপার থেকে আমাকে আলাদা করতে পারছিল না। এক প্রকার জোর করেই পুলিশ রূপার মৃতদেহটা আমার কাছ থেকে আলাদা করে নিয়ে গেল। একটু পর সবাই জানল বিষয় টা আবরার এসে আমাকে অনেক স্বান্তনা দিল। কিন্তু আমার মন তো মানছিল না।

রূপাকে ছাড়া কিভাবে থাকব আমি এটা ভেবেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। রূপার বাবা রূপার মৃত্যুর খবর শুনে পুরোপুরি কোমায় চলে গিয়েছিল। আর তার কিছুদিন পরেই রূপার বাবার মৃত্যু ঘটে। কারণ রূপার বাবার একমাত্র অবলম্বন ছিল রূপা। রূপাকে হারিয়ে সে শোকটা আর কাটিয়ে উঠতে পারে নি।

রূপার ময়নাতদন্ত করা হল। ময়নাতদন্ত শেষে যখন একটা বিষয় জানানো হল। তখন আমার কলিজা ভেদ করে একটা কষ্টের তীর বিদেছিল সেটা এখন মাঝে মাঝে যন্ত্রণা দেয়।

কারণ পুলিশ বলেছিল রূপার গর্ভে দুই মাসের বাচ্চা ছিল। আমার বুঝতে বাকি ছিল না এটা আমার বাচ্চায় ছিল। একে তো রূপাকে হারানোর কষ্ট তার উপর যোগ হল সন্তান হারানোর কষ্ট।পুলিশকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। সব প্রমাণ দিলাম। সৌরভের শাস্তি ও হল।

রূপা দ্বিতীয় বার ভাইরাল হল তবে এখন রূপাকে কেউ বকে নি। আগের ভিডিওতে যারা রূপাকে গালাগাল দিচ্ছিল হাস্যকর ব্যপার হলেও সত্যি যে পরের ভিডিওতে তারাই রূপাকে শ্রেষ্ঠ নারীর খেতাব দিচ্ছে। মানুষ পারেও।

ভাইরালের জগতে এসে আমরা আমাদের হিতাহিতজ্ঞান টুকু হারিয়ে ফেলি। কোন কিছু যাচাই না করেই যা ইচ্ছা বলতে থাকি। সেদিন আমার ও একটা ভুল ছিল আমি রূপার সমস্ত কথা না শুনেই রূপার সাথে বাজে ব্যবহার করেছি।

রূপাকে বুঝার চেষ্টা করি নি। সেদিন যদি রূপাকে একটু সাহস,বিশ্বাস, আর সাপোর্ট করতাম! তাহলে আর আজকে আমার অনাগত সন্তান আর প্রিয়তমা রূপাকে হারাতে হত না।

এই যে জামা বোরকা এগুলো সব রূপার জন্য কিনি। রূপাকে তো পড়াতে পারব না তাই মাঝে মাঝে অসহায় মানুষগুলোকে দেই। রূপার শোকটা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছিল। আবরার অনেক সাহায্য করেছিল। তবে রূপাকে হারানোর যন্ত্রণা টা সবসময় কুড়ে কুড়ে খেত।

ঐ যে ব্রিজটা যেখানে প্রতিরাতে দৌঁড়ে চলে যাই সেখান থেকেই ঝাপ দিয়ে আমার রূপা আকাশে চলে গিয়েছিল। কেন জানি না সেখানে গেলে রূপার শেষ নিঃশ্বাস টা শুনতে পাই। কেন জানি না তার সাথে সেখানে মন ভরে কথা বলতে পারি।

এভাবেই সেখানে দাঁড়িয়ে একদিন রূপার সাথে কথা বলছিলাম তখন নিরার আগমন হয়। নিরাকে সেদিন প্রথম দেখেই রূপার মুখটা ভেসে এসেছিল। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই নিরার দিকে। এর পর পরই মনে হয়েছিল, অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়ালে কেমন হয়। তাদের একটু সাহস দিলে তো মন্দ হয় না। কারণ আমি চাই না আর কোন মেয়ে সাপোর্ট না পেয়ে এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যাক।

তারপর এ আশ্রমটা খুলা। এ আশ্রমে অনেক অসহায় নারীরা থাকে। কিন্তু তাদের গুণের অন্ত নেই। সেটা তো কতক্ষণ আগে আপনাকে দেখালামেই। এ বলে অরন্য চুপ হয়ে গেল। তুলি অরন্যের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল

“সব পুরুষ এক না সব পুরুষ নারীকে নিয়ে খেলে না। কিছু পুরুষ নারীকে এতটাই ভালোবাসে সেটা তুলনা করার মত কোন বস্তু পাওয়া যায় না। সেই কিছু পুরুষেই হয়ত বাবা হয়, যোগ্য স্বামী হয়।”

যেমন নিলয় আর তুর্জ পুরুষ, আর অপরদিকে অরন্য একজন পুরুষ। দুদলের মধ্যে তফাৎ অনেক। এক দল নারীকে নিয়ে খেলে ফেলে দেয় আরেকদল ফেলে দেওয়া নারীকে কুড়িয়ে এনে সম্মানের জায়গা তৈরী করে দেয়। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ হয়ে বসে রইলো। চারদিকে তখন পিনপনা নীরবতা!

হুট করে তুলি তার ব্যাগে রাখা ছুরিটা ছুরে ফেলে দিল। ছুরিটা ফেলতে দেখে অরন্য খানিকটা বিস্মিত হয়ে বলল-
– কি ব্যাপার ছুরিটা ফেলে দিলেন যে? আমি যদি আপনাকে কিছু করে বসি তখন কি করবেন?

তুলি আকাশের তাকিয়ে বলল
– এ ছুরিটার আর দরকার পড়বে না। চলুন যাই।
– কোথায় যাবেন?

– নিয়ে গেলেই তো বুঝবেন।এত কথা কেন জিজ্ঞেস করছেন?
– কোথায় যাবেন বললে ভালো হয়। আর নিরা তো এখন না খাইয়ে যেতে দিবে না।
– পুলিশের কাছে যাব।

– কিন্তু আপনি তো পুলিশ ভয় পান।
তুলি অরন্যের দিকে তাকিয়ে আর্দ্র গলায় বলল

– হ্যাঁ ভয় পেতাম। কিন্তু এখন আর পাই না। অপরাধ তো আমি করি নি। আমি কেন ভয় পাব?এখানে কত অসহায় নারীরা নিজের জীবন পাল্টেছে। আমার থেকেও অসহায় যারা তারাও নিজের জীবনকে বদলাতে পেরেছে। আমি কেন পারব না?

আর অপরাধীরা ঘুরে বেড়াবে আর আমি অপরাধ না করে লুকিয়ে থাকব সেটা তো হয় না। ঐসব নরপশুর হাত থেকে তো আরও অনেক মেয়েকে রক্ষা করতে হবে। আপনি ঠিকেই বলেছেন

“আমি নারী আমি সব পারি। কারণ আমি মা, আমি মেয়ে, আমি অর্ধাঙ্গিনী”

অরন্য একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল
– এজন্যই আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছি।
আপনাকে এখানে না আনলে আপনার মনের পরিবর্তন হত না। সমাজ আপনাকে কখনও বদলে দিবে না। বরং সমাজকে আপনার বদলে দিতে হবে। এ সমাজ নারীদের মর্যাদা দিবে না। বরং মর্যাদা নিজের তৈরী করে নিতে হবে।
তুলি দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল।

সত্যিই তো তুলি কেন এত ভয় পাচ্ছিল। তুলি তো কোন দোষ করে নি। এই অসহায় নির্বাক সমাজ তুলির মত অনেক নারীকেই শিখিয়েছে চুপ করে সহ্য করতে। তুলি মনে মনে ভাবছে আমরা নিজেরাই তো নারীদের সম্মান দিতে পারছি না। নিজেরাই তো পুরুষদের সুযোগ করে দিচ্ছি অন্যায় করার।

কিন্তু কেন? এর উত্তর হয়ত কেউ দিতে পারবে না।নিজের অস্তিত্ব কেন বিলীন করে দিচ্ছি। তুলির মনের সাহসের মাত্রা বাড়ল। তুলি অরন্যের দিকে আবার তাকিয়ে বলল- পুলিশের কাছে কখন যাব সেটা বলেন। লড়াই করতে আমি প্রস্তুত। আর আমার বাবা মায়ের নম্বর দিচ্ছি আপনি একটু কথা বলুন।

– আমার তো মনে হয় আপনি বললেই ভালো হয়।আপনার বাবা-মা আপনি ভালো জানেন কিভাবে বললে ভালো হবে। আপাতত পুলিশের কাছে যাই ঘটনা খুলে বলি তারপর দেখি উনারা কি বলে।যদিও দেশের আইন ব্যবস্থা ভালো না তবুও এছাড়া উপায় নেই।

– আপনি যা বলেন তাই হবে। আচ্ছা….
এ বলে তুলি অরন্যের দিকে তাকাল। অরন্য ও তুলির দিকে তাকিয়ে রইল।

অরন্যের চোখে তুলি যেন এক ভালোবাসার বর্শা দেখতে পাচ্ছে। নিমিষেই তুলির মন বলে উঠছে অরন্য আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু মুখ দিয়ে সেটা বের হচ্ছে না। একেই হয়ত বলে মন ফাটে তো মুখ ফাটে না। অরন্যের চোখে ভরসার একটা ছাদ দেখতে পাচ্ছে। তুলির খুব ইচ্ছা করছে সে ছাদের আরশ তলে যেতে। কিন্তু কিভাবে যাবে সে উপায় যেন তুলির অন্তরায়।

অপরদিকে অরন্য যখন তুলির দিকে তাকিয়েছিল। রূপার সে চেনা চাহুনিটা বারবার মুখের সামনে ভেসে আসছিল। মনে হচ্ছিল অবিকল রূপার মত কেউ অরন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। দুটো আলাদা মানুষের চোখের চাহুনিতে এত মিল কি করে হয় অরন্য সেটা ভেবে পাচ্ছে না। কেন জানি না ঐ চোখপানে অরন্যের তাকিয়ে থাকতে বেশ ভালোই লাগছে। আর রূপার কথাটা কানে বাজছে।

ঐ যে রূপা বলেছিল “আকাশের বিশালতা অণুভব করা অনেক কঠিন ব্যপার। কিন্তু আকাশের দিকে তাকালেই এর গভীরতায় নিমিষেই হরিয়ে যাওয়া যায়। জানো অরন্য ভালোবাসাটাও ঠিক এরকমেই৷ ভালোবাসা শব্দটা চারটা অক্ষরের হলেও এর বিস্তৃতি অনেক।ভালোবাসার বিস্তৃতিতা একবার উপলব্ধি করতে পারলে খুব সহজেই ভালোবাসার গভীরে ডুবে যাওয়া যায়।”

দুজন দুজনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কেউ কোন কথা বলছে না। স্তব্ধ নীরবতা বিরাজ করছে। দুজনেই দুজনকে কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু কিসের বাঁধা যেন সবকিছু আটকে দিচ্ছে। হঠাৎ পরীর মিষ্টি কন্ঠে দুজন চমকে উঠে চোখ নীচে নামিয়ে ফেলে। পরী অরন্যের দিকে তাকিয়ে বলল-

– মামা, মামা আম্মু ডাকতেছে।
পরীর অস্পষ্ট কথাগুলো শুনে অরন্য পরীকে কোলে তুলে নিয়ে বলল-
– চল যাই মামা।

এ বলে তুলির দিকে তাকিয়ে বলল
– ছুরিটা ফেলে দিয়ে লাভ কি। ছুরিটা না হয় সাথে নিয়েই নিন। বাসায় না হয় সাজিয়ে রাখব। বিখ্যাত ছুরি বলে কথা।

খামখেয়ালি কথা শুনে তুলি রেগে অরন্যের দিকে তাকিয়ে বলল-
– সবসময় এত প্যাঁচাল কেন পারেন বলেন তো।নিরা খেতে ডেকেছে খেতে চলুন এবার।

অরন্য মুখ ভরে একটা হসি দিয়ে পরীকে কোলে নিয়ে হাঁটতে লাগল। তুলিও হাঁটতে থাকল। নিরার ঘরে ডুকেই অরন্য আর তুলি দেখল নিরা সব রান্না করে রেখেছে। তুলি নিরার দিকে তাকিয়ে বলল
– তুমি এত কিছু এত অল্প সময়ে রান্না কিভবে করলে?

পাশ থেকে অরন্য বলল-
– ও তো আর আপনার মত খাই আর ঘুমাই না আর ছুরি নিয়ে বাহাদুরি করে না।
তুলি চোখ গুলো বড় বড় করে অরন্যের দিকে তাকাতেই নিরা বলে উঠল-
– আরে তুলি রাগ করো না। অরন্য সবসময় এমন মজা করে। তুমিও না। ওর কথায় রাগ করো না।

– আরে কি যে বলো তুমি, রাগ কেন করব? তোমার রান্না দেখে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।এখনেই দাও খাব। খুব ক্ষুধা লাগছে। সকালে শুধু এক মগ কফি খেয়েছিলাম।
নিরা হাসতে হাসতে বলল

– কেন? নাস্তা কর নি কেন?
– অরন্য রান্না করে নি।
অরন্য পাশ থেকে বলে উঠল-

– নিজের নাস্তা নিজে রান্না করে খেলে কি পাপ হয় নাকি। মানুষের আশায় বসে থাকেন কেন?
নিরা এক গাল হেসে বলল
– হয়েছে ভাইয়া। তোমাদের ঝগড়া না হয় বাসায় গিয়ে করো। এখন চুপচাপ খেতে বসো।
এরপর তুলি আর অরন্য খেতে বসল।

তুলি নিরার কাছে বিদায় নিতে গেলে নিরা তুলিকে ডেকে বলল-
– একটা কথা বললে কি রাগ করবে?
তুলি একটু হেসে বলল-
– রাগ কেন করব?

– অরন্যকে একটু মানুষ করো। আর কত একা থাকবে। পারলে বুঝিয়ে শুনিয়ে বিয়ে করে ফেল।কেন জানি না অরন্য যখন তোমাকে নিয়ে এসেছে তখন মনে হয়েছিল অরন্যের মনে তোমার জন্য একটা জায়গায় তৈরী হয়েছে। মানুষটা সবার জন্য ভাবতে ভাবতে নিজের জন্য ভাবতে ভুলে গিয়েছে।

নিরার কথাটা শুনে তুলি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। তুলি বেশ ভালোই বুঝতে পরেছিল যে এ দুইমাসে সে অরন্যকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছে।অরন্যকে বলতে না পারলেও মনে মনে সেটা বারবার অনুভব করেছে। তুলি নিরাকে জড়িয়ে ধরে বলল-
– আমি চেষ্টা করব। আমার জন্য শুধু দোআ করো।

– সে তো সবসময় করব।

তুলি আর নিরাকে এমন অবস্থায় দেখে অরন্য একটা কাশি দিয়ে বলল-
– এই যে আপনার কি হয়েছে? যাবেন না নাকি।
– হ্যাঁ যাব তো চলুন।

তুলি নিরার কাছে বিদায় নিয়ে নিরার বাচ্চাটাকে একটু আদর করে চলে আসল অরন্যের সাথে।অরন্য তুলিকে নিয়ে আশ্রম থেকে বের হয়ে একটা রিকশা নিল। রিকশায় উঠে অরন্য তুলিকে বলল – আমার মনে হয় আজকে পুলিশের কাছে না গিয়ে আগে একটা উকিলের সাথে কথা বলি। আমার পরিচিত একজন মহিলা উকিল আছে যিনি সবসময় এসব অবহেলিত মেয়েদের নিয়ে কাজ করে।

তার কাছে সমস্ত বিষয়টা খুলে বলে তারপর কি করলে ভালো হবে সেটা জেনে বাকিটা করব কি বলুন?
– আপনার যা ভালো মনে হয় তাই করুন!

অরন্য তুলির দিকে তাকিয়ে দেখল তুলি বেশ শান্ত হয়ে বসে আছে। তুলির শান্ত চেহারা উপর পড়ন্ত বিকেলের রোদটা পড়েছে। গতিয়মান রিকশার সাথে সাথে তুলির মুখের উপর পড়ন্ত রোদটাও যেন ছন্দকার তরঙ্গাকারে এগিয়ে যাচ্ছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার সাহস হল না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেই মাথাটা নীচে নামিয়ে ফেলল।

ইতিমধ্যে রিকশাওয়ালা মামাও রিকশার গতি ধীর করে ব্রেক চেপেছে। ব্রেক চেপে রিকশার থেকে নেমে অরন্যের দিকে তাকিয়ে বলল-

– মামা ভাড়াটা দিন।
অরন্য আর তুলি রিকশা থেকে নামল। নামার পর অরন্য ত্রিশ টাকা দিল। ত্রিশ টাকা পেয়ে রিকশাওয়ালা মামা বললেন
– পাঁচ টাকা খুচরো দেন। আমার কাছে কোন খুচরো নেই!

অরন্য মানিব্যাগ খুঁজে মামাকে বলল-
– পাঁচ টাকা নাই মামা যা দিয়েছি নিয়ে যান।পাঁচ টাকা দিতে হবে না।

মামা একটা হাসি দিয়ে চলে গেল। পাশ থেকে তুলি বলল-
-ব্যাগে তো পাঁচ টাকা ছিল দিলেন না কেন।
অরন্য মানিব্যাগটা পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে বলল

– এটা আমার প্রিয়তমা রূপার দেওয়া প্রথম কয়েন টা। এটা দেয়া যাবে না।

তুলি কথাটা শুনে মনে মনে ভাবছে একটা মেয়ে কতটা ভাগ্যবান হলে এমন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিল। এসব ভেবে অরন্যের দিকে তাকিয়েই রইল। অরন্য তুলিকে ডেকে বলল,

– কি হল চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখছেন।উকিলের কাছে চলে এসেছি চলুন যাই।
তুলি চোখটা নামিয়ে বলল
– নাহ কিছু না, চলুন

দুজন উকিলের কাছে গেল। তুলি প্রথমেই খেয়াল করল একটা সুন্দর মেয়ে পরিপাটি হয়ে বসে আছে। অরন্যকে দেখেই হালকা হেসে বলল
– কেমন আছেন অরন্য সাহেব?

– হ্যাঁ ভালো আছি।
– অনেক দিন পর আসা হল।
– দরকার ছাড়া তো আসা হয় না। দরকারেই জ্বালাই আপনাকে।
– হিহিহি কি যে বলুন না। এটাকে জ্বালানো বললে বলব যে, এরকম জ্বালানো আরও পেতে চাই। তা বলুন এখন কি নিয়ে লড়তে হবে।

অরন্য পাশে থাকা তুলিকে দেখিয়ে বলল-
– এ তুলি। এর কথায় আপনাকে মেসেজে ডিটেইলস বলেছিলাম সকাল দিকে। কি হয়েছে সমস্ত ঘটনা আজকে সকালে জানার পরেই মেসেজ দিয়েছিলাম আপনাকে।

এখন সেটারেই ব্যবস্থা করতে চাচ্ছি। আর তুলি এ হচ্ছে মিসেস অধরা তোমার মামলা টা নিয়ে লড়বে। অনেক ভালো একজন উকিল।অধরা একটু হেসে বলল

– শুধু শুধু এত প্রশংসা না করলেও চলবে। যাইহোক আমি তুলির ব্যপার টা ভেবেছি। আমার মনে হয় প্রথমে তুলির উচিত নিলয়কে ডিভোর্স দেওয়া। তারপর তুলির জামিনের ব্যবস্থা করব।

জামিনের ব্যবস্থা হওয়ার পর পরই তুলি পুলিশের কাছে গিয়ে সমস্ত কিছু বলবে। আমার মনে হয় না এতে ওকে কোন শাস্তি দেওয়া হবে। তবে আইন হাতে তুলে নেওয়ার জন্য সাময়িক শাস্তি দিতে পারে। তবে আমি সেটাও মওকুফ করার ব্যবস্থা করে দিব। আমি কাগজ পত্র প্রস্তুত করে রাখব পরশুর মধ্যে। পরশু গিয়ে তুলি সব বলবে পুলিশকে।

অরন্য আরও কিছুক্ষণ কথা বলে অধরাকে বিদায় জানিয়ে তুলিকে নিয়ে বাইরে আসল। এসে পুনরায় রিকশা নিলো। রিকশাতে উঠে অরন্য তুলিকে বলল,

-এ উকিলেরও না একটা মজার কাহিনী আছে শুনবেন।
তুলি উৎসুক হয়ে বলল
– হ্যাঁ বলেন শুনি।

লেখাটা কেমন লাগলো অবশ্যই মন্তব্য করে জানাবেন। লেখার পরবর্তী পর্ব কি পড়তে চান?

শারমিন আঁচল নিপা
শিক্ষার্থী, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ
সরকারি বাংলা কলেজ, ঢাকা।