মাসিক - পিরিয়ড - ঋতুস্রাব - period - masik - menstruation

মাসিক (পিরিয়ড) বা ঋতুস্রাব সমস্যা ও সমাধান

স্বাস্থ্য লাইফস্টাইল

ঋতুস্রাব পিরিয়ড বা মাসিক (menstruation) একটি স্বাভাবিক শব্দ একজন নারীর কাছে। প্রাকৃতিক কারনেই একটি নির্দিষ্ট বয়সে নারীর জীবনে এই সময়টা আসে। সাধারণত প্রতি ২৪ থেকে ৩২ দিনের মধ্যে নারীদের ঋতুস্রাব, মাসিক (masik) বা পিরিয়ড হয়ে থাকে। প্রত্যেক নারীর শরীরে দুটি করে ডিম্বাশয় বা ওভারি থাকে। বাদামের মতোই আকার হয় ওভারির।

মাসিক (ঋতুস্রাব) বা পিরিয়ড কি?

মেয়েদের শরীরে মাসের একটা নির্দিষ্ট সময়ে ওভারি বা ডিম্বাশয় থেকে এগ বা ওভাম বা ডিম্বাণু নির্গত হয়। এই ওভামকে যদি স্পার্ম নিষিক্ত করে তবেই ভ্রূণ তৈরি হয়। ওভারি থেকে এই ওভাম নিঃসরণের সময় এলেই জরায়ুর প্রাচীর মোটা হতে শুরু করে।
নির্গত ওভাম মোটামুটি ১২-২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে।

এই সময় যদি শুক্রাণু বা স্পার্ম এই ওভামকে নিষিক্ত করে, তবেই ভ্রূণ তৈরি হয়। এই সময়ের মধ্যে যদি কোনও নিষেক না ঘটে, তা হলে এর প্রায় ১৪-১৫ দিন পরে জরায়ুর লাইনিং ছিঁড়ে রক্ত ও মিউকাসের সাথে বেরিয়ে আসে। এটাই মাসিক বা পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব।

মাসিক, পিরিয়ড কতো দিন হয়?

মাসিক সাধারনত তিন থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। বিষয়টি কোন অরুচিপূর্ন বা অপবিত্র বিষয় নয়। একজন নারীর ঋতুস্রাব শুরু হওয়া মানে ভেতরে একজন মানুষের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা শুরু। একজন নারী তার জরায়ু এটা সহ্য করে যাতে সে গর্ভধারন করতে পারে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এমন বিষয় নিয়ে কথা বলতে নারী বা পুরুষ উভয়ই অনিচ্ছুক অথচ এই বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশী কথা বলা দরকার।

মাসিক, পিরিয়ড (ঋতুস্রাব) হওয়ার লক্ষণ গুলো কি কি?

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে যে পিরিয়ডের উপসর্গ কী? আমরা কিছু বিষয় কে উপসর্গ হিসাবে ধরতে পারি:

  • মাসিক বা পিরিয়ডের ব্লিডিং সাধারণত ২-৭ দিন পর্যন্ত চলতে পারে।
  • এই সময় তলপেটে, কোমরে ব্যথা, মাসল ব্যথা হয়ে থাকে।
  • ব্রেস্ট স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে।
  • মাথা ধরা, পায়ে ব্যথা।
  • পিরিয়ডের সময় মুড সুইংস হয়।
  • মাসিক চলাকালীন সময় ব্রণ হতে পারে।

এই উপসর্গগুলি সাধারণভাবে বলা হয়েছে। এর সংখ্যা এবং ধরন আলাদা আলাদা হতে পারে। একজন সুরক্ষিত নারী একজন সুস্থ বাচ্চা জন্ম দিবে। সুতরাং সুরক্ষাটা দরকার।

মাসিক (পিরিয়ড) চলাকালীন সময়ে করনীয় ও নির্দেশনাঃ

ঋতুস্রাবের সময় একজন নারীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়। ২০১৪ সালে করা ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভেতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ নারী পিরিয়ডের সময় ন্যাকড়া বা পুরনো কাপড় ব্যবহার করেন যা অনেক সময় তাদের ফেলতে পারে মারাত্মক ঝুঁকিতে।

পুরনো কাপড় ঠিকমতো পরিষ্কার করে ব্যবহার না করায় সেখান থেকে ছড়াতে পারে রোগজীবাণু, যা হতে পারে জরায়ুর ক্যান্সারের কারণ।

এক্ষেত্রে মাসিকের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন এর বিকল্প নেই বললেই চলে। ধীর গতিতে হলেও নারীর পিরিয়ডের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামাঞ্চলেও।

মাসিক পিরিয়ড ঋতুস্রাব সুমাইয়া জাহান সামিনা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিরিয়ডের সময় পরিচ্ছন্নতায় গাফিলতি থেকে নারীর জরায়ু-মুখের ত্বকে নানা সমস্যা ছাড়াও হতে পারে জরায়ু সংক্রমণও। ভালো মানের ন্যাপকিন ব্যবহার না করলে একজন নারীর জীবন পড়তে পারে হুমকির মুখে।

সাধারণ মানের স্যানিটারি ন্যাপকিনে নানান ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ন্যাপকিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হয় তা হচ্ছে ব্যবহারের সময়কাল।

অনেকে একটি ন্যাপকিন সারাদিন ধরে ব্যবহার করে থাকেন, যা কোনোভাবেই উচিৎ নয়। একটি ন্যাপকিন চার থেকে ছয় ঘণ্টার বেশি সময় ব্যবহার করা উচিৎ নয়, কারণ এতে করে প্রথম দিকের শুকিয়ে যাওয়া রক্ত থেকে জীবাণু ছড়াতে পারে।

অতিরিক্ত রক্তপাত হলে চার থেকে ছয় ঘণ্টা সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে এর আগেই ন্যাপকিন পরিবর্তন করে ফেলা উচিৎ। এতে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে না।

একি সাথে বাজারে চলতি স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করে,পরিবেশবান্ধব ন্যাপকিন ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন বেশ কয়েক জন বিশেষজ্ঞ। এছাড়াও কেউ যদি মেনসট্রুয়াল কাপ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রেও তাকে যথাযথ পরিচ্ছন্নতা মেনে চলতে হবে।

মাসিক শুরু হওয়ার আগে শরীরে হরমোনের মারাত্মক ওঠাপড়া চলে। অনেকের ক্ষেত্রেই মাসিক খুব যন্ত্রণাদায়ক হয়। অনেকের আবার মাঝে মাঝে মাসিক হয় না। এক মাস হল তো তিন মাস হল না। এই মাসিকের অনুপস্থিতির একটা নাম অ্যামনোরিয়া।

যেসব মায়েরা বুকের দুধ খাওয়ান বাচ্চাকে তাদের ক্ষেত্রে, গর্ভাবস্থায় এবং মেনপজের পরে এই ঘটনা হওয়া স্বাভাবিক। খুব বেশি শারীরিক পরিশ্রম করেন যারা, তাদেরও এই সমস্যা হয়ে থাকে। তবে বাকি সাধারণের জন্য পিরিয়ড এরকম অনিয়মিত হলে ডাক্তার দেখানো উচিত।

অনেকের পিরিয়ডের সময় প্রচণ্ড ব্লিডিং হয়। প্রত্যেক মাসে যদি প্রচুর পরিমাণে রক্ত বেরিয়ে যায়, তা হলে রক্তস্বল্পতা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ঋতুস্রাব, মাসিক বা পিরিয়ড এর সমস্যায় ঘরোয়া সমাধান:

যাদের মাসিক অনিয়মিত হয় কিংবা পিরিয়ডের সমস্যায় ভোগেন তাঁরা নিচের ঘরোয়া পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন।

  • কাঁচা পেঁপের রস খেলে পিরিয়ড নিয়মিত হয়। কয়েক মাস খেয়ে দেখতে পারেন। তবে পিরিয়ড চলাকালীন খাবেন না।
  • রোজ সকালে এক চামচ কাঁচা হলুদ বাটা এক গ্লাস উষ্ণ দুধে মিশিয়ে খান।
  • অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারী পাতার ভিতরের মজ্জা মধু দিয়ে খালি পেটে খেতে পারেন।
  • এক চামচ আদা বাটা জলে ৫ মিনিট ফুটিয়ে সেই জল খাবার পর দিনে ৩ বার খান।
  • দু’চামচ জিরে সারা রাত জলে ভিজিয়ে রেখে সেই জল খান সকালে।
  • গরম দুধে এক চামচ দারচিনির গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে পেট ব্যথা কিছুটা কমবে।

ঋতুস্রাবের সময় ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন জাতীয় খাবার খাওয়া জরুরী। একি সাথে দেখা গেছে যে মহিলারা নিয়মিত অনুশীলন করেন তাদের ঋতুস্রাবের সময় বাধা, ব্যথা কম হয়।

পরিশেষে এই কথাই বলবো, মাসিক একজন নারীর কাছে লজ্জার নয়, বরং গর্বের বিষয়।

লিখেছেনঃ সুমাইয়া জাহান সামিনা (সমাজকর্মী)