alkananda mittir

বাইশ বছর বয়সে আঠেরো বসন্তের সুবাস: অলকানন্দা মিত্তির

সাহিত্য ক্যাম্পাস

বাইশ বছর বয়সে আঠেরো বসন্তের সুবাস পাওয়া যে যুবতীর হাত ধরে আগামী আঠেরোর জন্য যাত্রা শুরু করেছিলে, আজ সেই আঠেরো বছরে পদার্পনের শুভেচ্ছা যদি আমি না দেই, তবে আমার ঘূণে ধরা আঠেরো অপমানিত হবে।

আবেগ ঠাসা ফুলেল শুভেচ্ছা নিও! আঠেরো বসন্তের ঘূণ পোকায় খাওয়া যৌবনের শুভেচ্ছা নিও। আজ মাঝরাত্তিরে এক সুদর্শন পুরুষের সাথে আমার দেখা হবে। খুচরো পয়সার মত টুংটাং কিছু বাক্যালাপ দিয়ে শুরু হবে হয়ত।

তারপর পুরোনো ভাঙাচোরা স্মৃতিগুলো নিয়ে কিছু মুখোরোচক গল্পের বোঝা তৈরী হবে। সেই দৃশ্য কল্পনায় আনতেই আমার শিরদাড়া বেয়ে হিম শীতল জলের স্রোত বইছে।

মনে হচ্ছে আমি লজ্জায় ডুবে যাচ্ছি কয়েক শত কিউসেক পানির তলায়। ঠিক তার পরমুহূর্তেই, যখন মনে পড়ছে সেই সুদর্শন যুবকের পাশে বসে আছে অপরুপ সুন্দরী এক রমনী।

সেই মুহূর্তে আমার শ্বাসরোধ হয়ে যাচ্ছে। দমবন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছি কিংবা জ্ঞান হারাচ্ছি। নতুবা নবজীবনের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছি আমি। নিশ্চিত নই ঠিক কি হচ্ছে আমার। তবে সকল অনুভূতি এসে ধরা দিচ্ছে হৃদয়ে। এটুকু বেশ বুঝতে পারছি।

সোনালী সুতোয় পাড় দেওয়া মেরুন রঙা একটা শাড়ি পরে যাবো ভেবেছি। কাজলে ঠাসা দু’চোখের মাঝে একটা কালো রঙের টিপ। ঠোঁটের কোন রঙ থাকবে না। খোঁপায় গুঁজে নেবো আঠেরো টা গোলাপ। কল্পনায় দেখছি, আমাকে সদ্য ফুটে ওঠা অনিন্দ্য এক গোলাপের মত দেখাচ্ছে।

ফোন বেজে উঠলো হঠাৎ। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো সেই সুদর্শন যুবকের আওয়াজ, ”আসবে তো?” ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মৃদু হেসে জবাব দিলাম, “অবশ্যই।” বেশ উৎফুল্ল হয়ে ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না। তোমারও কি এমন হচ্ছে?”

”কিছু অপেক্ষায় সুখ থাকে, কিছু অপ্রাপ্তিতেও অনেক কিছু পেয়ে যাবার আনন্দ লুকিয়ে থাকে। শুধু উপভোগ করতে জানতে হয় মহাশয়। আজকের অপেক্ষাও হয়ত এমন কিছু মোহনীয় প্রাপ্তি দেবে কোন একসময়।”, জবাব দিলাম।

এমন ভারি কথা শোনার জন্য হয়ত তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। বেশ কিছুটা দমে গেলেন মনে হলো। তবে উৎসাহ হারালেন না। কিয়ৎক্ষন থেমে গলায় জোর এনে বললেন, ”ক’টা নাগাদ রওনা দেবে?” ”হাতের কাজগুলো শেষ হলেই বেরিয়ে পড়ব। সুযোগ হেলায় হারানোর পাত্রী নই যে!”

কথা না ফুরোতেই আমার মুখের কথা সহসা কেড়ে নিয়ে বললেন, “সন্ধ্যে সাত’টা তো বেজে এসেছে। হাতের কাজ সারবে কখন আর কখনই বা দেখা হবে?” আমি ছোট করে জবাব দিলাম, এসে পড়ব সময়মত, নিশ্চিত থাকুন। লাইন কেটে দিলাম। উৎসুক ব্যক্তির সাথে কথা বাড়ালে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার আগ্রহ বাড়ে বৈ কমে না। থামিয়ে দেওয়া নয়ত থেমে যাওয়াই উত্তম।

“ওভাবে তাকিয়ে আছো যে? কিছু ভাবছো?” ফোন রেখে মহিমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল অনিন্দিতা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জবাব দিলো মহিম, তোমাকে নিয়ে ভাবছি। সেদিনের তুমি, আমার পাশে বসে কত স্বপ্ন দেখতে।

দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন। দেশের বাইরে একসাথে ফেলোশীপ করতে যাওয়ার স্বপ্ন। সুগন্ধি মোম জ্বালিয়ে রাত জাগার স্বপ্ন। প্রেম ভালবাসা কিংবা সংসারের স্বপ্ন আরও কত কি। মাঝে কি সব হয়ে গেল। আর আজ, দু’হাতে জীবনকে ওড়াচ্ছো তুমি।

”তোমার সেই বান্দবীকে দেখছি না যে?” টেবিলে জমে থাকা ধূলোজড়ানো কাগজগুলো নাড়তে নাড়তে জানতে চাইল অনিন্দিতা।মুখ শুকিয়ে গেলো মহিমের। একটু থেমে শুকনা জিহ্বায় খানিকটা ঢোক গিলে নিয়ে বলল, “রেস্টুরেন্টের বিল আজকাল যা বেড়েছে!”

হঠাৎ অনিন্দিতার হাত দু’টো চেপে ধরল সে। ঠান্ডা অথচ কাতর স্বরে বলল, “আরেকটিবার ভাববে অনু? শুধু একটিবার?” সজোরে হেসে উঠলো অনিন্দিতা। মুহূর্তেই থেমে গিয়ে মহিমের মুঠো থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিল। শাড়ির আঁচল টেনে হিমশীতল নিচু গলায় বলল, ডেকেছো কেন?

এবারে মহিম বেশ ভয়ার্ত চোখে তাকালো। অনুর এভাবে তাকানো দেখলে আগে থেকেই ভয় পেতো সে। তাই কথা না বাড়িয়ে বলতে শুরু করলো, “যা জমানো ছিল, সেসব ভেঙেই তো সিনেমা বানিয়েছিলাম। লাভ হলো না কিছু, জানোতো।” বলতে বলতে উদ্ভ্রান্তের মত মেঝেতে পায়চারি করতে শুরু করল সে।

দু’জনেই নিশ্চুপ কিছুক্ষন। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। শুধু মহিমের পায়ের খসখস আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে সারা ঘরময়। নর্দমার পাশে বিদ্যুতের তারে বসা কাকের কর্কশ ডাক শোনা যাচ্ছে। দূরে সবজিওয়ালার গলার স্বর শোনা যাচ্ছে, “সবজি লাগে, সবজি…. আলু পটল ঝিঙা কাঁচামরিচ………..”

দেয়াল ঘড়িতে ঘন্টার শব্দ পেয়ে সম্বিত ফিরে পায় অনু। ঘাড় ঘুরিয়ে মহিমের দিকে ফিরে তাকায়, চোখে চোখ পড়তেই চমকে ওঠে সে। ব্যাগ থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে এগিয়ে দেয় মহিমের দিকে। দুর্ভিক্ষের পরে ভাগাড়ে কোনো মৃত পশু ফেললে যেমন শকুনরা উদ্ভ্রান্তের মত খাদ্যের গন্ধে ওড়াউড়ি করতে থাকে, ঠিক সেভাবেই সিগারেটের প্যাকেট টা নিলো মহিম।

আলো বাতাসহীন গুদামঘরে কোনো মানুষকে খাবারবিহীন দীর্ঘসময় আটকে রাখার পরে লোকালয়ে এনে খেতে দিলে যেভাবে গোগ্রাসে গিলতে থাকে, ঠিক সেভাবেই একটা সিগারেট ধরালো সে। সামান্য একটু খাদ্যের জন্য মানুষ কত অদ্ভূত আচরণ করতে পারে! কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে দিলেন সেই সুদর্শন পুরুষ। মিষ্টি হেসে সহজ স্বাভাবিক কণ্ঠে শুধালেন, “আসতে নিশ্চয়ই কষ্ট হয়নি?”

ফুলের তোড়া টা ভদ্রলোকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চঞ্চল পায়ে ভেতরে ঢুকল অনিন্দিতা। সারা ঘরে বেশকিছু ফটোগ্রাফ টাঙানো।আচমকা একটি ছবির সামনে এসে ঠায় দাঁড়িয়ে পড়ল। একটু থেমে এগিয়ে গেল পরের ছবিটায়। তার বেশ কয়েকটা ছবি ঝুলছে দেয়ালে।

কাছে এগিয়ে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সেগুলো। কখন যে গাল বেয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে গেছে বুঝতেই পারত না যদি না একজন মাঝবয়েসী সুন্দরি এসে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা না জানাতো।

ভদ্রমহিলা তাকে টানতে টানতে নিয়ে এলেন, একে একে আলাপ করিয়ে দিলেন সবার সাথে। এতো লোকের ভীড়েও একজোড়া চোখ বারবার সেই ছবিগুলোর দিকেই যাচ্ছিল। চোখজোড়া অনুর। ভদ্রলোক সবার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে অনুর সামনে এলেন। কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। অনুর চোখ ভরে এলো কান্নায়।

জল গড়িয়ে যাওয়ার আগেই ভদ্রলোক জড়িয়ে ধরলেন তাকে। পাগলের মত এলোমেলো ভাঙা গলায় বলতে লাগলেন, “কেন গিয়েছিলে? জানো না, তুমি ছাড়া এই বাড়িটা শ্মশান হয়ে যায়!” অনিন্দিতা এবারে কান্না থামাতে পারলো না। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো।

ভদ্রমহিলা এসে জড়িয়ে ধরলেন পেছন থেকে। অতিথিরা সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ফিনিক ফোঁটা জোৎস্নার আলোয় ঘরভর্তি মোম হার মেনে গেছে। আকাশ আজ পরিপূর্ণ রুপে সেজেছে।

মুখভর্তি ধোয়া ছেড়ে পরপর দু’টো সিগারেট খেলো মহিম। আধপোড়া সিগারেটটায় শেষবার টান দিতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল সে।বজ্রপাতের শব্দে যেমন চমকে যায় কেউ ঠিক সেভাবে কেঁপে উঠলো মনে হলো। অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে ভীতু গলায় জিজ্ঞেস করলো, “সিগারেট ধরেছো কবে অনু?”

মুখের দিকে চেয়ে রইল সে। উত্তরের অপেক্ষায় নয়; সম্ভবত আশংকায়। অনিন্দিতা আগের মতই খলখল করে হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে মহিমের দিকে চেয়ে বলল, “আমি ওসব ছুঁলে প্যাকেটের মুখ খোলা থাকতো নিশ্চয়ই!”

মহিম কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেল। চোখ নামিয়ে নিল সে। মুহূর্তেই আবার চোখ মেলে তাকিয়ে বলল, ”তবে-” অনিন্দিতা এবারে আর ধোঁয়াশা করে কিছু বলল না। সোজা জবাব দিল, “বুভুক্ষ কে খাবার দিলে আনন্দে ওদের চোখ কেমন চকচক করে ওঠে তা দেখতেই ওসব ছাইপাশ কাছে রেখেছিলাম মহিম।”

অনুর গলাটা কেমন যেন ইস্পাত কঠিন শোনা গেল। সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠলো, “হ্যাপি এ্যানিভার্সারি।” কেক কাটা শেষ হলে সবাইকে খাবার টেবিলে ডাকলেন মি. এন্ড মিসেস অনিন্দ্য।

আজ আমাদের আঠেরো তম বিবাহ বার্ষিকী। আপনাদের সুবিধার্থে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি আয়োজন করতে। এই আয়োজন করার পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, আমার একমাত্র ছোটবোন অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে গিয়েছিল, আজ দেখা করেছে প্রায় ৪ বছর পর! তাও আবার অচেনা নম্বরে যোগাযোগ করে নতুন করে পরিচয় পেয়েছি দুজনে। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

কথা শেষ হলে সবাই খেতে শুরু করল। পোলাও, কোর্মা, জর্দা, পায়েস, ফিরনি কিংবা যার যা ইচ্ছে, তুলে নিয়ে খাচ্ছে। মহিমের কঙ্কালসার দেহটার দিকে তাকিয়ে ব্যাথা অনুভব করল অনিন্দিতা। দৌড়ে গেল রান্নাঘরটার দিকে।

একটা বাচ্চা ইদুর অসহায়ভাবে তাকালো ওর দিকে। কয়েকটা আরশোলা বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে চারিদিকে। দরজায় পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালো সে। মহিমের মুখের দিকে উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল, রোজগার না থাকলে ঘরে বাজার হয় বুঝি? কতদিন এই বাড়িতে চুলা জ্বলেনা, তার হিসাব রাখার মতও কেউ নেই অনু।

শেষবার কবে বাড়িতে ফুটানো ভাত খেয়েছিলাম; নাহ, শেষবার কবে খেয়েছিলাম তাইতো মনে নেই অনু। তুমি কি না এখন চালডালের খোঁজ করছ! অনিন্দিতা খোলা জানালা দিয়ে তাকালো পাশের বিল্ডিং টার দিকে। দেয়ালে নতুন একটা পোস্টার লাগাচ্ছে কয়েকটি ছেলে। ৩১শে আগস্ট শুভমুক্তি!

অলকানন্দা মিত্তির
শিক্ষার্থী, বাংলা ডিপার্টমেন্ট
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা।

বিশেষ ঘোষণাঃ
আপনার লেখা ছোটগল্প, জীবনের না বলা গল্প অথবা উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শেয়ার করুন সবার সাথে। পত্রিকায় প্রকাশের জন্য যোগাযোগ করুন আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেঃ

https://www.facebook.com/banglanewsinfo.official