nowshin tabassum

গতানুগতিক চিন্তা-ভাবনার বাইরে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি ঢাবি শিক্ষার্থীর উদ্যোগ

সাক্ষাৎকার ক্যাম্পাস

গতানুগতিক চিন্তা-ভাবনার বাইরেও নিজের আলাদা একটা পরিচয় ও স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য আজ উদ্যোগকে বেছে নিচ্ছে আমাদের শিক্ষিত সমাজ। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি গতানুগতিক চিন্তাকে পিছনে ফেলে তাই নিজের উদ্যোগকে বেছে নিয়েছেন এই ছাত্রী।

বাংলা নিউজ ইনফো আজ সাক্ষাৎকার নিয়েছে এমনই একজন শিক্ষার্থীর। যিনি পড়াশোনার পাশাপাশি গড়ে তুলছেন তার নিজস্ব উদ্যোগ।

নওশিন তাবাসসুম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের কবি সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। নওশিনের জন্মস্থান রংপুর।

(১) উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তাটা কিভাবে আসলো?
– উদ্যোক্তা হিসেবে আমি একেবারেই নতুন। অনেকেই ভাবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ি মানে চাকরি তো আমি করবোই। কিন্তু খুব ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল আমি চাকরি করব না। এমন কিছু করবো যাতে লোক আমাকে আলাদা করে চেনে।

চাকরির একঘেয়েমি আমাকে খুব একটা টানে না। স্কুল ও কলেজ জীবনেই মাথায় অনেক রকমের আইডিয়া এসেছে। কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে হয়তো বা কখনো পড়ালেখার চাপে সেগুলোর বাস্তবায়ন করে ওঠা হয়নি। আর নারী হওয়ার প্রতিবন্ধকতা তো আছেই।

ছোটবেলা থেকে কোন প্রকার প্রশিক্ষণ ছাড়াই আমি মোটামুটি মানের আর্ট করতে পারতাম। তো সেখান থেকে মেইনলি আর্ট নিয়ে কিছু করার ইচ্ছা জাগে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেখলাম অনেকেই তার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনে কিছু করার চেষ্টা করছে। আমি ভাবলাম তাহলে আমি কেন নই। লেটস ডু দ্যাট। খুলে ফেললাম ফেইসবুক পেজ। এভাবেই মূলত আমার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা।

(২) আপনার শিক্ষাজীবন ও ব্যক্তি জীবনের না বলা গল্প গুলো জানতে চাই।
– আমি রংপুরের মেয়ে। রংপুর শহরেই আমার বেড়ে ওঠা। কলেজ জীবন পর্যন্ত এখানেই পড়ালেখা করেছি। শিক্ষা জীবনের প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার তথাকথিত GPA-5 পেলেও আমি নিজেকে মধ্যম মানের শিক্ষার্থী বলতে ইচ্ছুক।

শিক্ষাজীবনে খুব এক্সট্রাঅরডিনারি শিক্ষার্থী না হলেও শিক্ষকদের ভীষণ প্রিয় ছিলাম। বিশেষ করে ইংরেজি ছিল আমার প্রিয় বিষয়। ইংরেজি খুব মন দিয়ে পড়তাম। তাই ইংরেজি শিক্ষকদেরও ভীষণ প্রিয় ছিলাম।

এক্ষেত্রে লায়ন্স স্কুল এন্ড কলেজ, রংপুর এর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ রায়ের কথা বলতেই হয়। তিনি আমার শিক্ষাজীবনে পাওয়া সবথেকে ভালো শিক্ষকের একজন।

আমার খুব ইচ্ছে ছিল আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয় নিয়ে পড়বো। সেই মোতাবেক অনেক পরিশ্রমও করেছি। তবে আল্লাহর রহমতে ইংরেজি বিষয় না পেলেও বর্তমানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছি।

এক্ষেত্রে কোনো না বলা কথা যদি বলতে বলা হয় তাহলে বলব সাধারণ জ্ঞান বিষয় পড়ার প্রচন্ড অনিহা থাকায় শুধুমাত্র ছয়দিনের প্রস্তুতিতে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সে ক্ষেত্রে আল্লাহর অশেষ রহমত বলতেই হয়।

তাছাড়াও ঢাকায় ভর্তি কোচিং করতে এসে নানা রকম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পরবর্তীতে কিছুদিনের মাথায় ঢাকার কোচিং ছেড়ে দিয়ে রংপুরে ফিরে যাই এবং সেখানে কিছু স্থানীয় ভাইয়াদের কাছে প্রাইভেট পড়ে এবং নিজের প্রস্তুতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিই।

উল্লেখ্য যে শুধুমাত্র ঢাকা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা দেই এবং দুই বিশ্ববিদ্যালয়েই টিকে যাই।

আর ব্যক্তিজীবনের কথা বলতে গেলে, ব্যক্তিজীবনে আমি একজন খুবই সৌখিন, উদ্যমী এবং স্বপ্নবাজ মানুষ। স্বপ্ন দেখতে ভীষণ ভালোবাসি। স্বপ্ন দেখি আমার SAGA Shop একদিন দেশের নামকরা ব্র্যান্ডে পরিণত হবে এবং আমি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিদের একজন হবো।

অনেকেই বলতে পারে শুধুমাত্র স্বপ্ন দেখলে কি হবে? না, শুধুমাত্র স্বপ্ন দেখলেই হবেনা। আমি এই ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারি বাকি সবকিছুর মালিক আল্লাহ।

আরও পড়ুনঃ মেধা খাটান, নয়তো একটা সময় মরিচা পড়ে যাবে

(৩) আপনি কি কি পণ্য নিয়ে বিজনেস করেন এবং কিভাবে তার বিস্তারিত।
– আমি মূলত নারীদের আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন ও শৈল্পিক পোশাক এবং গহনা নিয়ে কাজ করি। হ্যান্ড পেইন্টেড নান্দনিক গহনা এবং পোশাক আমার পেইজের মূল আকর্ষণ।

তাছাড়াও আমার শপে রেডিমেট পোশাক এবং গহনাও বিক্রয় করা হয়। আমার শপে যে কাঠের গহনা গুলো পাওয়া যায় সেগুলো পেইন্ট এবং বানানোর কাজ আমি নিজেই করে থাকি।

আমার শপের ড্রেসগুলোও আমি নিজেই পেইন্ট এবং ডিজাইন করে থাকি। খুব শীঘ্রই আমার পেজে পুরুষদের জন্য হ্যান্ড পেইন্টেড পাঞ্জাবি আসতে চলেছে।

আমি কোয়ান্টিটিতে না কোয়ালিটিতে বিশ্বাসী। তাই আমার পেইজে খুব কমসংখ্যক প্রোডাক্ট থাকলেও সেগুলো সবগুলি কোয়ালিটিফুল। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমরা সারা বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি দিয়ে থাকি। আমার জানামতে খুব কম সংখ্যক ফেসবুক পেজ আছেন যারা এই সার্ভিস দিতে পারবেন।

(৪) বিজনেসের জন্য পরিবার থেকে কোন উৎসাহ বা বাধা পান কিনা?
– জীবন মানেই আসলে বাধা। আর দশটা সাধারণ মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল পরিবারের মতোই আমার পরিবারও চায় আমি একটি ডিসেন্ট জব করি।

আমার বাবার মতে বিজনেস এর মত এত বড় একটা জিনিস সামলানো আমার পক্ষে সম্ভব না। তাছাড়াও আত্মীয়-স্বজনের নানা রকম কথা ছিল এবং আছে।

কিন্তু আমি কখনই কোন কিছুতে বাধা মনে করিনি। আর এক্ষেত্রে বলতেই হয় আমার মা আমার সবথেকে বড় সাপোর্টার। তিনি আমাকে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই মানসিকভাবে সাপোর্ট করে গেছেন। আমার সহপাঠী এক বন্ধুও সব সময় তার মুল্যবান উপদেশ দিয়ে আমার পেইজের পাশে থাকে।

(৫) এটা নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
– এক কথায় বলতে গেলে SAGA Shop কে ব্র‍্যান্ডে পরিণত করা। তবে তা শুধু ধনীদের ব্র্যান্ড নয় আমার আপনার নির্বিশেষে সবার ব্র্যান্ড।

আজকাল ব্যান্ড এর প্রোডাক্ট বলতে আমরা যেসব প্রোডাক্টগুলোকে বুঝি তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের নাগালের বাহিরে। কিন্তু আমি SAGA কে এমন একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করতে চাই যা সাশ্রয়ী মূল্যে ইউনিক পণ্য দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে। তবে যেহেতু আমি এখনো শিক্ষার্থী আছি তাই SAGA আপাতত অনলাইন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সকলের পাশে থাকবে।

তবে আশা রাখছি অদূর ভবিষ্যতে SAGA একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে যেখানে শুধুমাত্র মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্যই কিনতে পারবেন না সেখানে অনেকেরই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সবশেষে আমার ছোট্ট SAGA Shop টি কে বড় করে তুলতে আমি সকলের দোয়া প্রার্থী। আমার ফেসবুক পেজের লিংকঃ https://www.facebook.com/sagashop.bd/

(৬) যারা নতুন নতুন উদ্যোক্তা হতে চায় ও নতুন কিছু নিয়ে কাজ করতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলেন।
– আমি নিজেই একজন নতুন উদ্যোক্তা। তবে আমার উদ্যোক্তা হওয়া এবং তার পটভূমির অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি কিছু না করা এবং করার মাঝখানে একটা অনেক উঁচু সিঁড়ি আছে। আপনাকে শুধুমাত্র একটু কষ্ট করে পা উঁচু করে পার হয়ে যেতে হবে।

আপনার মধ্যে যদি সৃজনশীলতা থাকে ঘরে বসে থেকে সময় নষ্ট করবেন না। সৃজনশীলতাকে কাজে লাগান। এতো কষ্ট করে এতো এতো পড়ালেখা করে বেকার এর টাইটেল বা হাউসওয়াইফের টাইটেল নেওয়ার চেয়ে কিছু চেষ্টা করে দেখুন।

ট্রাস্ট মি আজকেই যারা জ্যোতিষী হয়ে আপনার উদ্যোগের মজা উড়াতে ব্যস্ত তারাই কালকে অনিচ্ছা সত্বেও আপনার তারিফ করতে বাধ্য।

বাংলা নিউজ ইনফো পত্রিকাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

বিশেষ ঘোষণা:
আপনার লেখা কলাম, ছোটগল্প, জীবনের না বলা গল্প অথবা উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শেয়ার করুন সবার সাথে। পত্রিকায় প্রকাশের জন্য যোগাযোগ করুন আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেঃ
https://www.facebook.com/banglanewsinfo.official

1 thought on “গতানুগতিক চিন্তা-ভাবনার বাইরে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি ঢাবি শিক্ষার্থীর উদ্যোগ

Comments are closed.