Bangladesh-Chatro-league-বাংলাদেশ-ছাত্রলীগ-BSL

কক্সবাজারে ধর্ষক-অপরাধী চক্রের আশ্রয়দাতা ছাত্রলীগ নেতা

বাংলাদেশ অপরাধ রাজনীতি

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয় বা মদদেই পর্যটন নগরী কক্সবাজারে চলছে সংঘবদ্ধ ভয়ঙ্কর নানা অপরাধ। গত ২২ ডিসেম্বর রাতে কক্সবাজারে এক নারী পর্যটক সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার খবরে শহরজুড়ে ওই অপরাধী চক্রের তৎপরতার বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। ওই নারী ধর্ষণের ঘটনায় মূলহোতা হিসেবে যে আশিকুল ইসলাম আশিকের নাম ছড়িয়ে পড়েছে তার সঙ্গে নেপথ্যের আশ্রয়দাতাদেরও ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। 

স্থানীয় বাসিন্দাসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ‘ধর্ষক’ আশিকুর, জয় ও রিয়াজরা কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে কক্সবাজারে সুপরিচিত। 

সাদ্দাম হোসেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার পর ক্ষমতা জানান দিতে এবং নিজের ভিত্তি মজবুত করতে ওদের আশ্রয়দাতা হয়ে ওঠেন। কক্সবাজার শহরের বাইরে বাড়ি হওয়ায় আধিপত্যের বিচারে সাদ্দাম কিছুটা দুর্বল ছিল। জয়, আশিক গং ছাত্রদল বা অন্য দলের রাজনীতি করলেও ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম নিজের আধিপত্য বাড়ানোর প্রয়োজনে অপরাধীদের কাছে টেনে নেন।

ইদানীং বিচ এলাকায় যেসব অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে তার সব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের কর্মী বা সমর্থকরা।

এ ছাড়া কক্সবাজার সদর-রামু আসনের এমপির সঙ্গেও রয়েছে ‘ধর্ষক’ আশিকের সুসম্পর্ক। এ ঘটনার পর তাদের এমন একটি ছবি ফেসবুকে ঘুরছে।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘এরা ছাত্রলীগের কেউ নয়। তারা দোষ করলে সর্বোচ্চ শাস্তি হোক সেটা আমিও চাই। তাছাড়া আমি সভাপতি বিধায় যে কেউ আমার সঙ্গে ছবি তুলতেই পারে, তা দোষের কিছু নয়।’

স্থানীয়রা বলছেন, কক্সবাজারে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মূল প্রশ্রয়দাতা হোতারা হলেন রাজনৈতিক নেতা। তাদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও নিজেদের শক্তি বাড়াতে তারা বিভিন্ন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী লালন-পালন করেন।

পর্যটকদের জন্য আধুনিক, নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়ে থাকলেও মূলত এসব সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কারণে পর্যটকদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে পৃথিবীর এই দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের শহরটি। বিশেষ করে নারী পর্যটকরা এখানে প্রায় প্রতিনিয়তই যৌন হয়রানি, ইভটিজিং ও ধর্ষণের শিকার হন। 

পর্যটকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বামী ও সন্তানকে জিম্মি করে ওই নারী পর্যটককে ধর্ষণের ঘটনার পর চরম নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। কক্সবাজারের অধিকাংশ বিচ পয়েন্ট ও হোটেল-মোটেল সবদিকে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক।

কয়েক দিন আগে মেরিন ড্রাইভ সড়কের পেঁচারদ্বীপ এলাকা থেকে চার স্কুলছাত্রকে সেন্টমার্টিনে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার নামে অপহরণ করা হয়। হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টে পর্যটকদের কাছ থেকে গলাকাটা বাণিজ্যের অভিযোগ অনেক পুরনো। 

সম্প্রতি প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন পর্যটকসহ স্থানীয়রা। নামে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকলেও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়েই চলছে। থেমে নেই ইয়াবাসহ মাদক কারবার। পর্যটন এলাকায় রয়েছে দখল-বেদখলের ঘটনাও।

এরই মধ্যে শহরের পর্যটনের মূল কেন্দ্র লাবণী পয়েন্ট থেকে এক পর্যটক নারীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেছে বখাটে দুর্বৃত্তরা। আর এসব ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

গোপন সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার শহরে অন্তত ৩২ জনের একটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। মূলত তাদের নেতৃত্বে ঘটছে নানা অপরাধ। তার একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে বাহারছড়ার ধর্ষক আশিকুল ইসলাম। তার নেতৃত্বে সন্ধ্যার পর ফাঁদ পাতা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে পর্যটকদের ওপর।

এভাবেই হয় কারও সর্বস্ব লুট করে নেয় বা কাউকে ধর্ষণ করে। অনেক পর্যটকই এমন ভয়ঙ্কর বিপদের মুখোমুখি হয়েও নিজের সম্মানহানি বা বিড়ম্বনার ভয়ে পুলিশকে জানান না।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই আশিকুল চার মাস আগে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। সে একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। মাদকসহ একাধিক মামলারও আসামি। তার অন্য সদস্যরা হলো- আব্দুল জব্বার, ইস্রাফিল হুদা জয়, বিজয়, মোবারক, শাকিল, সালমান শাহসহ আরও অনেকে। তার মধ্যে শাকিল ও সালমান শাহ কয়েকদিন আগে আটক হয়। বর্তমানে তারা জেলে আছে।

গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে বেড়াতে এসে ধর্ষণের শিকার হন এক পর্যটক নারী। তিনি অভিযোগ করেন, ওইদিন রাতে কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্ট থেকে তুলে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়। তখন জিম্মি করা হয় তার স্বামী ও সন্তানকে।

তিনি প্রথমে ৯৯৯-এ ফোন দেন পুলিশকে। সাড়া না পেয়ে সাইনবোর্ডে র‍্যাবের নম্বর পেয়ে আরেকজনের সহযোগিতায় ফোন দেন। ওইদিন রাত ২টায় র‍্যাব এসে তাকে হোটেল- মোটেল জোনের জিয়া গেস্ট ইন থেকে উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় ৩ অপরাধীকে শনাক্ত করেছে র‍্যাব। তার মধ্যে গত ২৩ ডিসেম্বর রাতে জিয়া গেস্ট ইনের ম্যানেজার রিয়াজকে আটক করে র‍্যাব। তাকে র‍্যাব হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাছাড়া এ ঘটনায় ওই নারীর স্বামী বাদী হয়ে ৭ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন।

সত্যতা নিশ্চিত করে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, কক্সবাজারে নারী পর্যটক ধর্ষণের ঘটনায় ৪ জনের নাম উল্লেখসহ মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা হয়েছে। আসামিরা হলো- আশিকুুল ইসলাম আশিক, বাবু, ইসরাফিল ও রিয়াজ উদ্দিন। ট্যুরিস্ট পুলিশকে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) হাসানুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগী নারী যেভাবে বর্ণনা করেছেন, ঠিক সেভাবেই নথিভুক্ত করে আমরা মামলা নিয়েছি। ধর্ষণের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত ও ডাক্তারি পরীক্ষা প্রয়োজন। এরপর বলা যাবে ধর্ষণের বিষয়টি। তবে ওই নারীর ৯৯৯-এ কল করার অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি ৯৯৯-এ পুলিশকে ফোন করেননি বলে জানান।

এর আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এক অস্ট্রেলীয় নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে একটি রিসোর্টের দুই কর্মচারী। এ ঘটনায় তখন রিসোর্টের মালিক সোহাগের ভাইসহ দুইজনকে আটক করেছিল পুলিশ। হিমছড়ির মারমেইড বিচ রিসোর্টে ঘটনাটা ঘটছিল।

তাছাড়া ২০০৫ সালে কক্সবাজারে বিদেশি এক নারীকে ধর্ষণ করা হয়। এসব ঘটনায় অপরাধীরা আটক হলেও পরবর্তী সময়ে তারা জামিনে বের হয়ে আসে।

এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি জিল্লুর রহমানের ফোনে একাধিকবার কল করার পরও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।